বাংলাদেশ    রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

Copyright © 2026 • All Rights Reserved

যে বয়সে মাঠে দৌড়ানোর কথা, সে বয়সে হাসপাতালের বিছানায় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বাঁচানোর লড়াই

সড়ক দখল আর বেপরোয়া অটোরিকশার বলি ১৩ বছরের আহনাফ


আনিস প্রধান
১১ ফলোয়ার
প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
পাঠক: ২০৪ জন
প্রিন্ট

সড়ক দখল আর বেপরোয়া অটোরিকশার বলি ১৩ বছরের আহনাফ
অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হওয়ার পর আহনাফ।

যে বয়সে ফুটবল হাতে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, যে বয়সে গোল করার আনন্দে মুখরিত হওয়ার কথা চারপাশ, সেই বয়সেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিজের পা বাঁচানোর লড়াই করছে ১৩ বছরের কিশোর মুন্সী আহনাফ ইবনে আকবর। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে দেশের একজন নামকরা ফুটবলার হবে। কিন্তু রাজধানীর সড়কে অব্যবস্থাপনা, রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনা তার সেই স্বপ্নকে ঠেলে দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

মুগদা আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফের জীবনে নেমে আসা এই দুর্ভোগ কেবল একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়; এটি নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও তুলে ধরেছে।

রাস্তার বালুতে উল্টে গেল রিকশা, ভেঙে গেল স্বপ্নের পথ

ঘটনাটি প্রায় তিন মাস আগের। মায়ের সঙ্গে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চড়ে বাবার এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিল আহনাফ। রাজধানীর মুগদা এলাকায় রাস্তার ওপর বেআইনিভাবে স্তূপ করে রাখা নির্মাণসামগ্রীর বালুতে পিছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় অটোরিকশাটি। অন্য আরোহীরা সামান্য আঘাত পেলেও রিকশার নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হয় আহনাফ।

অটোরিকশার লোহার রডের প্রচণ্ড আঘাতে তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় কিশোরটির জীবন। যে পা দিয়ে ফুটবল মাঠে ছুটে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখত সে, সেই পা নিয়েই শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও অনিশ্চয়তার লড়াই।

ছয়টি মেটাল রডেও শেষ হয়নি যন্ত্রণা

গুরুতর আহত আহনাফকে দ্রুত নেওয়া হয় মুগদা ইসলামিয়া পাবলিক হাসপাতালে। সেখানে প্রথম অস্ত্রোপচারে তার পায়ে ছয়টি মেটাল রড বসিয়ে হাড়ের অবস্থান ঠিক রাখার চেষ্টা করেন চিকিৎসকেরা। সংক্রমণ না হলে তিন মাস পর আরও একটি বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ সেই দ্বিতীয়, জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হচ্ছে একই হাসপাতালে। কিন্তু অস্ত্রোপচার শেষ হলেই যে সব দুশ্চিন্তার অবসান হবে, তা নয়। সামনে রয়েছে সুস্থ হয়ে ওঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়া, শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা শঙ্কা।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর আহনাফ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারলেও ভবিষ্যতে আক্রান্ত পায়ে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটি এখন আর কেবল মাঠের প্রস্তুতি বা প্রতিভার ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে তার পায়ের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার ওপরও।

চিকিৎসার খরচে দিশেহারা পরিবার

একদিকে সন্তানের শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে চিকিৎসার বিপুল ব্যয়—দুই দিক থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি আহনাফের পরিবার। তার বাবা মুন্সী আকবর ইবনে কবীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। সীমিত আয়ের এই পরিবারের জন্য সন্তানের চিকিৎসার খরচ বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসায় ইতোমধ্যে দুই লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার, অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) খরচ এবং ওষুধপত্র মিলিয়ে আরও প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

একটি দুর্ঘটনা যেন পরিবারটির আর্থিক স্বস্তিও কেড়ে নিয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার আশায় একের পর এক ব্যয় মেটাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন অভিভাবকেরা। যে অর্থ একটি মধ্যবিত্ত পরিবার সন্তানের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ কিংবা সংসারের প্রয়োজন মেটাতে সঞ্চয় করতে পারত, সেই অর্থই এখন ব্যয় হচ্ছে দুর্ঘটনার পরিণতি সামাল দিতে।

সড়ক কার—নাগরিকের, নাকি নির্মাণসামগ্রীর?

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার অভিযোগ নতুন নয়। কোথাও বালু, কোথাও ইট, কোথাও রড কিংবা অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দখল করে রাখে চলাচলের জায়গা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বেপরোয়া যান চলাচল, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা।

এসব অব্যবস্থাপনা পথচারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সড়ক শুধু যানবাহন চলাচলের জায়গা নয়; এটি মানুষের নিরাপদে চলাফেরার অধিকারও। অথচ সেই সড়কই যখন অবহেলা ও অনিয়মের শিকার হয়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে সাধারণ মানুষ।

আহনাফের দুর্ঘটনার পেছনে ঠিক কার কতটা দায় রয়েছে, তা নির্ধারণে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তবে রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হয়ে থাকলে তা কীভাবে ঘটল, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ কী করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি।

একইভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিরাপদ চলাচল, চালকদের নিয়ম মানা এবং যানবাহনের উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার পর শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; এমন দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

আহনাফের প্রশ্ন—আমার স্বপ্নের দায় নেবে কে?

১৩ বছরের আহনাফ হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, কীভাবে একটি দুর্ঘটনা তার স্বাভাবিক জীবনকে এতটা বদলে দিল। তার কাছে হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে, কবে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে যেতে পারবে, কবে আবার ফুটবল নিয়ে দৌড়াতে পারবে?

একটি শিশুর স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো যায় না। তার চিকিৎসার খরচ, পরিবারের উৎকণ্ঠা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সড়কের অব্যবস্থাপনা কখনোই ছোটখাটো বিষয় নয়।

আহনাফের ঘটনায় দায় নির্ধারণের পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, সড়কের ওপর অবৈধভাবে নির্মাণসামগ্রী রাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও আইন মানতে হবে।

কারণ, একটি শিশুর ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন কেবল তার পরিবারের সম্পদ নয়; সেটি তার বেড়ে ওঠার অধিকার, তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।

আহনাফ এখন হাসপাতালের বিছানায়। তার হাতে ফুটবল নেই, চোখের সামনে সবুজ মাঠও নেই। আছে অস্ত্রোপচারের অনিশ্চয়তা, চিকিৎসার ব্যয় আর আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষা।

এই অপেক্ষার শেষ কোথায়, তা সময়ই বলবে। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—সড়কের সামান্য অব্যবস্থাপনার মূল্য যদি একটি শিশুকে তার স্বপ্ন দিয়ে চুকাতে হয়, তাহলে সেই অব্যবস্থাপনা বন্ধ করার দায়িত্ব নেবে কে?

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ৫/৫ (২ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

পটুয়াখালীতে মানসিক রোগী দিয়ে চলছে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান!

পটুয়াখালীতে মানসিক রোগী দিয়ে চলছে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান!

মিরপুরে বিএনপির তৃণমূলে ক্ষোভ: ‘দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করলে কাউকে ছাড় নয়’

মিরপুরে বিএনপির তৃণমূলে ক্ষোভ: ‘দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করলে কাউকে ছাড় নয়’

মিরপুরে লেগুনা স্ট্যান্ড দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রতিবাদে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন

মিরপুরে লেগুনা স্ট্যান্ড দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রতিবাদে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন

দল ও প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত করতে চাইনি, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছি: ইশরাক

দল ও প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত করতে চাইনি, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছি: ইশরাক

ছয় মাসেও দায়িত্ব নিতে পারছে না নবনির্বাচিত কমিটি, বাধার অভিযোগ

ছয় মাসেও দায়িত্ব নিতে পারছে না নবনির্বাচিত কমিটি, বাধার অভিযোগ

জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর কথা ভাবছে ইসি: আনোয়ারুল ইসলাম

জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর কথা ভাবছে ইসি: আনোয়ারুল ইসলাম

জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর কথা ভাবছে ইসি: আনোয়ারুল ইসলাম

জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর কথা ভাবছে ইসি: আনোয়ারুল ইসলাম

সড়ক দখল আর বেপরোয়া অটোরিকশার বলি ১৩ বছরের আহনাফ

সড়ক দখল আর বেপরোয়া অটোরিকশার বলি ১৩ বছরের আহনাফ

জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর কথা ভাবছে ইসি: আনোয়ারুল ইসলাম

জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর কথা ভাবছে ইসি: আনোয়ারুল ইসলাম

দুমকিতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বদলি নিয়ে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অবস্থানে দুই পক্ষ

দুমকিতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বদলি নিয়ে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অবস্থানে দুই পক্ষ

সুরমা নিউজ

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬


সড়ক দখল আর বেপরোয়া অটোরিকশার বলি ১৩ বছরের আহনাফ

প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

যে বয়সে ফুটবল হাতে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, যে বয়সে গোল করার আনন্দে মুখরিত হওয়ার কথা চারপাশ, সেই বয়সেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিজের পা বাঁচানোর লড়াই করছে ১৩ বছরের কিশোর মুন্সী আহনাফ ইবনে আকবর। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে দেশের একজন নামকরা ফুটবলার হবে। কিন্তু রাজধানীর সড়কে অব্যবস্থাপনা, রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনা তার সেই স্বপ্নকে ঠেলে দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

মুগদা আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফের জীবনে নেমে আসা এই দুর্ভোগ কেবল একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়; এটি নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও তুলে ধরেছে।

রাস্তার বালুতে উল্টে গেল রিকশা, ভেঙে গেল স্বপ্নের পথ

ঘটনাটি প্রায় তিন মাস আগের। মায়ের সঙ্গে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চড়ে বাবার এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিল আহনাফ। রাজধানীর মুগদা এলাকায় রাস্তার ওপর বেআইনিভাবে স্তূপ করে রাখা নির্মাণসামগ্রীর বালুতে পিছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় অটোরিকশাটি। অন্য আরোহীরা সামান্য আঘাত পেলেও রিকশার নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হয় আহনাফ।

অটোরিকশার লোহার রডের প্রচণ্ড আঘাতে তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় কিশোরটির জীবন। যে পা দিয়ে ফুটবল মাঠে ছুটে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখত সে, সেই পা নিয়েই শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও অনিশ্চয়তার লড়াই।

ছয়টি মেটাল রডেও শেষ হয়নি যন্ত্রণা

গুরুতর আহত আহনাফকে দ্রুত নেওয়া হয় মুগদা ইসলামিয়া পাবলিক হাসপাতালে। সেখানে প্রথম অস্ত্রোপচারে তার পায়ে ছয়টি মেটাল রড বসিয়ে হাড়ের অবস্থান ঠিক রাখার চেষ্টা করেন চিকিৎসকেরা। সংক্রমণ না হলে তিন মাস পর আরও একটি বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ সেই দ্বিতীয়, জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হচ্ছে একই হাসপাতালে। কিন্তু অস্ত্রোপচার শেষ হলেই যে সব দুশ্চিন্তার অবসান হবে, তা নয়। সামনে রয়েছে সুস্থ হয়ে ওঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়া, শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা শঙ্কা।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর আহনাফ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারলেও ভবিষ্যতে আক্রান্ত পায়ে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটি এখন আর কেবল মাঠের প্রস্তুতি বা প্রতিভার ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে তার পায়ের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার ওপরও।

চিকিৎসার খরচে দিশেহারা পরিবার

একদিকে সন্তানের শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে চিকিৎসার বিপুল ব্যয়—দুই দিক থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি আহনাফের পরিবার। তার বাবা মুন্সী আকবর ইবনে কবীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। সীমিত আয়ের এই পরিবারের জন্য সন্তানের চিকিৎসার খরচ বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসায় ইতোমধ্যে দুই লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার, অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) খরচ এবং ওষুধপত্র মিলিয়ে আরও প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

একটি দুর্ঘটনা যেন পরিবারটির আর্থিক স্বস্তিও কেড়ে নিয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার আশায় একের পর এক ব্যয় মেটাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন অভিভাবকেরা। যে অর্থ একটি মধ্যবিত্ত পরিবার সন্তানের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ কিংবা সংসারের প্রয়োজন মেটাতে সঞ্চয় করতে পারত, সেই অর্থই এখন ব্যয় হচ্ছে দুর্ঘটনার পরিণতি সামাল দিতে।

সড়ক কার—নাগরিকের, নাকি নির্মাণসামগ্রীর?

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার অভিযোগ নতুন নয়। কোথাও বালু, কোথাও ইট, কোথাও রড কিংবা অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দখল করে রাখে চলাচলের জায়গা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বেপরোয়া যান চলাচল, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা।

এসব অব্যবস্থাপনা পথচারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সড়ক শুধু যানবাহন চলাচলের জায়গা নয়; এটি মানুষের নিরাপদে চলাফেরার অধিকারও। অথচ সেই সড়কই যখন অবহেলা ও অনিয়মের শিকার হয়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে সাধারণ মানুষ।

আহনাফের দুর্ঘটনার পেছনে ঠিক কার কতটা দায় রয়েছে, তা নির্ধারণে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তবে রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হয়ে থাকলে তা কীভাবে ঘটল, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ কী করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি।

একইভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিরাপদ চলাচল, চালকদের নিয়ম মানা এবং যানবাহনের উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার পর শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; এমন দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

আহনাফের প্রশ্ন—আমার স্বপ্নের দায় নেবে কে?

১৩ বছরের আহনাফ হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, কীভাবে একটি দুর্ঘটনা তার স্বাভাবিক জীবনকে এতটা বদলে দিল। তার কাছে হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে, কবে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে যেতে পারবে, কবে আবার ফুটবল নিয়ে দৌড়াতে পারবে?

একটি শিশুর স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো যায় না। তার চিকিৎসার খরচ, পরিবারের উৎকণ্ঠা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সড়কের অব্যবস্থাপনা কখনোই ছোটখাটো বিষয় নয়।

আহনাফের ঘটনায় দায় নির্ধারণের পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, সড়কের ওপর অবৈধভাবে নির্মাণসামগ্রী রাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও আইন মানতে হবে।

কারণ, একটি শিশুর ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন কেবল তার পরিবারের সম্পদ নয়; সেটি তার বেড়ে ওঠার অধিকার, তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।

আহনাফ এখন হাসপাতালের বিছানায়। তার হাতে ফুটবল নেই, চোখের সামনে সবুজ মাঠও নেই। আছে অস্ত্রোপচারের অনিশ্চয়তা, চিকিৎসার ব্যয় আর আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষা।

এই অপেক্ষার শেষ কোথায়, তা সময়ই বলবে। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—সড়কের সামান্য অব্যবস্থাপনার মূল্য যদি একটি শিশুকে তার স্বপ্ন দিয়ে চুকাতে হয়, তাহলে সেই অব্যবস্থাপনা বন্ধ করার দায়িত্ব নেবে কে?


সুরমা নিউজ

CHIEF EDITOR:
Farid Ahmed Reza
EDITOR:
Shamsul Alam Liton

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
সংবাদ শুনুন
সড়ক দখল আর বেপরোয়া অটোরিকশার বলি ১৩ বছরের আহনাফ
0:00 / 0:00
1x