উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
অসদাচরণ, সহকর্মীকে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি এবং বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বিনষ্টের অভিযোগ—একটির পর একটি অভিযোগ উঠছে পটুয়াখালী সদর উপজেলার ১৯৫ নং টাউন কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাবরিনা বেগমের বিরুদ্ধে। লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, এরপরও কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগকারী সহকারী শিক্ষক পলি আক্তার দাবি করেছেন, সাবরিনা বেগমের আচরণের কারণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি ও মানসিক চাপের শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পুরোনো অভিযোগের পরও বদলায়নি পরিস্থিতি?
পলি আক্তারের লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সাবরিনা বেগম এর আগে ৯৯ নং সেন্টারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে অসদাচরণ, সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিনষ্টের মতো অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে ১৯৫ নং টাউন কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নতুন কর্মস্থলেও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন পলি আক্তার।
৮ আগস্টের পর নতুন করে অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে পলি আক্তার দাবি করেছেন, চলতি বছরের ৮ আগস্ট থেকে সাবরিনা বেগমের সঙ্গে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে তিনি চরম বিব্রত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
তার অভিযোগ, সাবরিনা বিভিন্ন সময়ে সহকর্মীদের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলেন, হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব আচরণের কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশেও।
ব্যবস্থা না নিয়ে কেন ‘সময়’ দেওয়া হচ্ছে?
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীর দাবি, একাধিক অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে সুরমা নিউজের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হলে পটুয়াখালীর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিও) মাসুদ করিম বলেন, সহকারী শিক্ষক সাবরিনা বেগম মানসিক রোগী। তাকে সংশোধনের পথে আসার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে।
ডিপিও মাসুদ করিম বলেন, “আমি ব্যবস্থা নিতে পারি, চাকরি থেকে বাড়িতেও পাঠাতে পারি। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখা হচ্ছে।”
তার এই বক্তব্যের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণ ও সহকর্মীকে হয়রানির অভিযোগ থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি মানবিক বিবেচনার সীমা কোথায়? আর সংশোধনের জন্য সময় দেওয়ার মধ্যে অভিযোগকারী শিক্ষক ও অন্য সহকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্বই বা কে নেবে?
‘মানসিক রোগী’ মন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন
ডিপিওর বক্তব্য অনুযায়ী সাবরিনা বেগমের মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তার কোনো চিকিৎসাগত অবস্থা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত চিকিৎসা-নথি প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে বিষয়টি ডিপিওর বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা, কর্মস্থলে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে কি না—তা নিয়েও।
তদন্ত চান অভিযোগকারী
পলি আক্তার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া আবেদনে অভিযোগটি জরুরি ভিত্তিতে আমলে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তার আবেদনে ৮ আগস্টের ঘটনাসহ সাবরিনা বেগমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা, তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি বা হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে অন্যত্র পদায়ন বা সংযুক্ত করার আবেদনও করা হয়েছে।
মানবিকতা বনাম কর্মপরিবেশ—দায়িত্ব কার?
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগকারী ও অন্যান্য সহকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
মানবিক বিবেচনায় কাউকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হলে সেই সময়ের মধ্যে যাতে অন্য কোনো শিক্ষক হয়রানি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
এখন প্রশ্ন একটাই—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত কবে হবে এবং অভিযোগকারী শিক্ষকসহ বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেবে?
এদিকে ডিপিও মাসুদ করিমের বক্তব্য— “আমি ব্যবস্থা নিতে পারি, চাকরি থেকে বাড়িতেও পাঠাতে পারি। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখা হচ্ছে”— এই অবস্থানকে ঘিরে বিষয়টি এখন আরও আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে কতটা প্রমাণিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।