উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
ঢাকা জেলা যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়ন, রেজিস্ট্রেশন নং ঢাকা-৯৭৪-এর নবনির্বাচিত কার্যকরী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ ও ইউনিয়নের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে বাধার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কমিটির সভাপতি ফারুক হোসেন। তার দাবি, আইন ও গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও ছয় মাসের বেশি সময় ধরে নির্বাচিত কমিটি ইউনিয়নের কার্যালয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।
বুধবার এক বক্তব্যে নবনির্বাচিত কমিটির সভাপতি ফারুক হোসেন এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি ইউনিয়নের সংকট নিরসনে সরকারি নথি, শ্রম আইন ও নিবন্ধিত গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানান।
নির্বাচন ও সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্নের দাবি
নবনির্বাচিত কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঢাকা জেলা যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়ন-৯৭৪-এর কার্যকরী কমিটির নির্বাচন ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। তাদের দাবি, বাংলাদেশ শ্রম আইন, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও নিবন্ধিত গঠনতন্ত্র অনুসরণ করেই নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনী ফলাফলসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিভাগীয় শ্রম দপ্তর, ঢাকায় জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নির্বাচন-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য শ্রম দপ্তরের পক্ষ থেকে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয় বলে নবনির্বাচিত কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই শেষে শ্রম দপ্তরের স্মারক নং ৪০.০২,০০০০,০০০,১০১,৩৪,০০০২.২৫.২৭০, তারিখ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ১৯ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সরকারি ফি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে শ্রম দপ্তর থেকে ২১ সদস্যবিশিষ্ট কার্যকরী কমিটির সত্যায়িত তালিকা দেওয়া হয় বলে দাবি কমিটির।
কার্যালয়ে দায়িত্ব নিতে গিয়ে বাধার অভিযোগ
সত্যায়িত তালিকা পাওয়ার পর ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নবনির্বাচিত কমিটির সদস্যরা রাজধানীর গাবতলীতে ইউনিয়নের পূর্বনির্ধারিত কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেন।
তবে ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে পূর্ববর্তী কমিটির সভাপতি আব্বাস উদ্দিনের নেতৃত্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তি ইউনিয়ন কার্যালয়ে এসে তাদের কার্যক্রমে বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন ফারুক হোসেন।
নবনির্বাচিত কমিটির দাবি, পরিস্থিতি যাতে সংঘর্ষ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় রূপ না নেয়, সে কারণে তারা সাময়িকভাবে কার্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হন।
ফারুক হোসেন বলেন, “আমরা কোনো সংঘাত চাই না। আমরা শ্রমিকদের অধিকার, ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে সংগঠন পরিচালনা করতে চাই।”
বহিরাগত হস্তক্ষেপের অভিযোগ
নবনির্বাচিত কমিটির অভিযোগ, ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের ব্যক্তি ও বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তাদের দাবি, গত ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে নবনির্বাচিত কমিটির বিরুদ্ধে শ্রম অধিদপ্তরে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। ওই অভিযোগকারীদের মধ্যে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
এ অবস্থায় নবনির্বাচিত কমিটির প্রশ্ন, শ্রম দপ্তরের যাচাই-বাছাই শেষে সত্যায়িত তালিকা পাওয়ার পরও কেন তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রভাব নয়, বরং নির্বাচন-সংক্রান্ত সরকারি নথি, শ্রম আইন ও ইউনিয়নের নিবন্ধিত গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতেই বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে হবে।
আব্বাস উদ্দিনকে ঘিরে নানা অভিযোগ
পূর্ববর্তী কমিটির সভাপতি আব্বাস উদ্দিনকে ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন নবনির্বাচিত কমিটির নেতারা।
তাদের অভিযোগ, আব্বাস উদ্দিন দীর্ঘ সময় নির্বাচন ছাড়াই ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন এবং পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে।
এছাড়া শ্রমিক উন্নয়নের নামে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ ব্যবহারের বিষয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে নবনির্বাচিত কমিটির পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, এসব অভিযোগকে তারা কোনোভাবেই আদালতের রায় হিসেবে উপস্থাপন করছে না। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
কয়েকজন পরিবহন নেতা ও মালিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নবনির্বাচিত কমিটির পক্ষ থেকে কয়েকজন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের মধ্যে মো. হানিফ, সামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মো. সাইফুল ইসলাম এবং মো. হুমায়ুন কবির খাঁনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির দাবি, বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফের সঙ্গে কমিটি পরিচালনার বিষয়ে ছয়বার আলোচনা হলেও কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
প্রতিহিংসা নয়, আইনানুগ সমাধানের দাবি
নবনির্বাচিত কমিটির সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, তারা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা চান না। তাদের দাবি, নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিয়ম থাকলে আইন অনুযায়ী তদন্ত করা হোক।
তিনি বলেন, “যদি আমাদের নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী তদন্ত হোক। যদি আমাদের কমিটি বৈধ না হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কারণ দেখিয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত দিক। কিন্তু নির্বাচন আইন ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়ে থাকলে এবং সরকারি শ্রম দপ্তর থেকে সত্যায়িত কমিটির তালিকা দেওয়া হয়ে থাকলে, নির্বাচিত কমিটিকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে।”
ছয় দফা দাবি
সংকট নিরসনে নবনির্বাচিত কমিটির পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. ঢাকা জেলা যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়ন-৯৭৪-এর নির্বাচন ও সত্যায়িত কমিটির সরকারি নথি পর্যালোচনা করে দ্রুত নির্বাচিত কমিটিকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া।
২. ইউনিয়ন কার্যালয়ে নির্বাচিত কমিটির কার্যক্রমে ব্যক্তি বা বহিরাগত কোনো গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
৩. নবনির্বাচিত কমিটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. পূর্ববর্তী কমিটির কার্যকাল, নির্বাচন ছাড়া দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক কল্যাণের নামে অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও অডিট করা।
৫. ইউনিয়নের নেতৃত্বে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে নিয়মিত নির্বাচন ও গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
৬. রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত প্রভাব বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পরিবহন শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
‘শ্রমিক ইউনিয়ন কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়’
সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, একটি শ্রমিক ইউনিয়ন কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি শ্রমিকদের সংগঠন। শ্রমিকদের ভোট, সংগঠনের গঠনতন্ত্র এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, গত কয়েক মাস ধরে তারা সংঘাত এড়িয়ে ধৈর্য ধরেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কার্যকর সমাধান না হওয়ায় সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জনসম্মুখে তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি শ্রম মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে সরকারি নথি, শ্রম আইন, নিবন্ধিত গঠনতন্ত্র ও প্রকৃত শ্রমিকদের স্বার্থের ভিত্তিতে ঢাকা জেলা যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়ন-৯৭৪-এর সংকটের দ্রুত ও ন্যায়সংগত সমাধান করা হোক।
ফারুক হোসেনের ভাষায়, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমরা সংঘাত চাই না, দখলদারিত্ব চাই না। আমরা চাই—শ্রমিকদের ভোটে নির্বাচিত কমিটি শ্রমিকদের জন্য কাজ করার সুযোগ পাক।”